নতুন বাজেট পাস না হওয়ায় শুক্রবার মধ্যরাতে বন্ধ হয়ে গেছে মার্কিন সরকারে অর্থায়ন। গভর্নমেন্ট শাটডাউন বলে অভিহিত এ অচলাবস্থার কারণে ১০ লাখ মার্কিন কর্মী অবৈতনিক ছুটিতে যেতে বাধ্য হবে। মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হবে সপ্তাহে ৬৫০ কোটি ডলার। অভিবাসন ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর নীতি এবং রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির রশি টানাটানিতে বাজেট পাস হয়নি। ট্রাম্প এজন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষ নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে জিম্মি করেছে। খবর এপি, রয়টার্স।
দুই দলের নেতাদের উপর্যুপরি আলোচনা ও দরকষাকষির পরও মার্কিন সিনেট বাজেট অনুমোদনে ব্যর্থ হয়েছে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানদের নেতা মিচ ম্যাককনেল ভোটাভুটি প্রলম্বিত করেও নতুন সাময়িক বাজেট প্রস্তাবটিকে বৈতরণী পার করাতে পারেননি। কংগ্রেস ফ্লোরে যেকোনো প্রস্তাবে ভোটাভুটি সচরাচর ২০ মিনিটে সম্পন্ন হয়। ম্যাককনেল ৯০ মিনিট সময় দিয়েও প্রস্তাব পাসে কাঙ্ক্ষিত ৬০ ভোট সংগ্রহে ব্যর্থ হন। ১০০ সদস্যের সিনেটে প্রস্তাবের বিপক্ষে গেছে ৪৮ ভোট। বিপক্ষে ভোটদাতাদের মধ্যে রিপাবলিকান সিনেটর চারজন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিলপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে রিপাবলিকানরা চার সপ্তাহের জন্য এ সাময়িক বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে প্রতিনিধি পরিষদে তারা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রস্তাবটি পাস করিয়ে আনতে সমর্থ হন। কিন্তু বাজেট প্রস্তাবে অভিবাসন ইস্যু সংযুক্ত করতে রিপাবলিকানদের আপত্তির কারণে সিনেটে সংখ্যালঘিষ্ঠ ডেমোক্র্যাটরা প্রস্তাবটি আটকে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবছর শুরু হয় অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে। চলতি অর্থবছরে এ নিয়ে তিনবার সাময়িক বাজেট পাস করে প্রশাসনে অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো পাসকৃত সাময়িক বাজেটের মেয়াদ শুক্রবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে। এর ফলে অনিশ্চয়তায় পড়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা, বিচার, অর্থ, পর্যটন, রাজস্ব, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রায় ১০ লাখ কর্মী। নতুন বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত এসব কর্মীকে সাময়িকভাবে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হবে। দপ্তরগুলোর কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দেবে।
স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরসের মতে, গভর্নমেন্ট শাটডাউনের ফলে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি সপ্তাহে ৬৫০ কোটি ডলার। সংস্থাটি বলেছে, বাজেটের অভাবে সরকার বেতন না দিলে কর্মীরা ব্যয় করতে পারে না। এতে ব্যবসায়ের ক্ষতি হয় এবং বেসরকারি খাতের চাকুরেরা আয়বঞ্চিত হয়। আবার খুচরা বিক্রির দোকানে কেনাকাটা কমলে সরকার কর থেকে বঞ্চিত হয়। আর সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হ্রাসের কারণে ব্যাহত হয় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি।
শাটডাউনে অচলাবস্থা দেখা দেবে হোয়াইট হাউজেও। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও কার্যালয় হোয়াইট হাউজে মোট কর্মী ১ হাজার ৭১৫ জন। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি কর্মীকে গতকাল থেকে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হয়েছে বলে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আসন্ন সম্মেলনে যেতে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মীকে সঙ্গে পাবেন বলে কর্মকর্তারা জানান।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেছেন, প্রতিরক্ষা বিভাগের অসামরিক (নন-অ্যাক্টিভ ডিউটি) কর্মীরা ছুটিতে যাওয়ায় দাপ্তরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ ও জঙ্গিবিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বিঘ্নিত হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন কর বিভাগের ৯০ ভাগ কর্মীকে অবৈতনিক ছুটি দিতে হবে। এর ফলে ট্যাক্স রিফান্ড ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্মীদের ছুটিতে পাঠানোয় সোস্যাল সিকিউরিটি নম্বর, আয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই ব্যাহত হবে এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নতুন ঋণ প্রক্রিয়াকরণ থেমে যাবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট আলোচনার সময় ট্রাম্পের একটি ঘোষণার জেরে কংগ্রেসে অচলাবস্থা শুরু হয়। গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস (ডাকা) কর্মসূচির মেয়াদ বৃদ্ধি না করার ঘোষণা দেন। ড্রিমারস প্রোগ্রাম নামে পরিচিত এ কর্মসূচি বন্ধ হলে হুমকিতে পড়বে শৈশবে অবৈধ পন্থায় যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো সাত লাখ অভিবাসীর জীবন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এসব অভিবাসীকে সুরক্ষা দিতে ২০১৩ সালে পাঁচ বছরের জন্য কর্মসূচিটি চালু করেন।
বাজেট অনুমোদনের শর্ত হিসেবে ডেমোক্র্যাটরা ড্রিমার কর্মসূচির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা অভিবাসন ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি হননি। দুপক্ষের দরকষাকষি ও সমঝোতার মধ্যে অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত তিনবার কংগ্রেসে স্বল্পমেয়াদি বাজেট পাস হয়েছে। ড্রিমারস কর্মসূচির মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে। মেয়াদ না বাড়লে এর আওতায় সুরক্ষা পাওয়া সাত লাখ মানুষ গ্রেফতার ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়বে। চতুর্থবারের মতো সাময়িক বাজেট পাসের আগে ডেমোক্র্যাটরা কর্মসূচিটির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রশ্নে অনমনীয় অবস্থান নেন। বিকল্প হিসেবে তারা চার সপ্তাহের পরিবর্তে দুই সপ্তাহের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের পরামর্শ দেন, যাতে আরেকটি প্রস্তাবনা অনুমোদনের আগে ড্রিমার ইস্যুতে দরকষাকষি করা যায়।
রিপাবলিকানরা চার সপ্তাহের বাজেট নিয়ে অনমনীয় অবস্থান নেন। ড্রিমারস কর্মসূচিটি পৃথকভাবে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে তারা বলেছেন, বাজেটের সঙ্গে অভিবাসন আলোচনা জুড়ে দেয়া ঠিক হয়নি। দুপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে শুক্রবার শেষ মুহূর্তে হোয়াইট হাউজ থেকেও সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হয়। সিনেট ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারকে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানান। দুজনের আলোচনায় ট্রাম্প ড্রিমার ইস্যুতে কিছুটা নমনীয় হওয়ার আশ্বাস দেন বলে হোয়াইট হাউজের একটি সূত্রের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। বৈঠক শেষে এক টুইটে ট্রাম্প নিজেও সমঝোতা হচ্ছে বলে জানান। কিন্তু সিনেটর শুমার হোয়াইট হাউজ থেকে ক্যাপিটল হিলে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হোয়াইট হাউজ থেকে আবার তাকে ফোন করা হয়। হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ জন কেলি এ সময় তাকে জানান, ড্রিমার নিয়ে আবারো আলোচনা করতে হবে। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে সিনেটরের দেয়া পরামর্শ ‘বেশি উদার’ বলেও কেলি মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউজ থেকে ডেমোক্র্যাট নেতাকে এ বার্তা দেয়ার পর সিনেটে আর কোনো সমঝোতা সম্ভব হয়নি।
শাটডাউনের জন্য কংগ্রেসে দুই দল পরস্পরকে দায়ী করেছে। সিনেট ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এ অচলাবস্থাকে ‘ট্রাম্প শাটডাউন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মার্চ থেকে সাত লাখ স্বপ্নবাজ তরুণের জীবন বিপন্ন হবে জেনে আমরা ছাড় দিতে পারি না। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, মার্কিন নাগরিকরা দেখেছেন— কারা সরকারকে সচল রাখতে চায়, আর কারা নাগরিকদের স্বার্থের চেয়ে অভিবাসীদের বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র সারাহ স্যান্ডার্স এ শাটডাউনকে ‘শুমার শাটডাউন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, যারা এ অবস্থা সৃষ্টি করেছেন, তারা আইনপ্রণেতা (লেজিসলেটর) নন, বরং প্রতিবন্ধকতাবাদী ও পরাজয়মুখী (অবস্ট্রাকশনিস্ট লুজার্স)। তিনি আরো বলেন, ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি রাখা অবস্থায় আমরা অবৈধ অভিবাসীদের মর্যাদা নিয়ে আলোচনায় বসতে পারি না।
শাটডাউনের পর থেকে উপর্যুপরি সাতটি টুইটে ডেমোক্র্যাটদের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন ট্রাম্প। এসব টুইটে তিনি ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জিম্মি করে অবৈধ অভিবাসীদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চান এবং সিনেটে আরো রিপাবলিকান নির্বাচিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন।