ইন্টেলিজেন্স, ইন্টেলেকচুয়াল, ইন্টেলেকচুয়ালিটির প্রতি সবসময়ই আমার প্রবল আকর্ষণ কাজ করে। সোজা বাংলায় বললে পন্ডিত,বই পড়ুয়া, আঁতেল টাইপ মেয়ে ভীষনভাবে টানে আমায়।
আগে জানতাম না কি এর কারন, কেন আর সবার যখন মডেল/ ফিল্মের হিরোইন/জিরো ফিগার ইত্যাদি ভালো লাগে, সবাই যাদের প্রতি আর্কষন অনুভব করে তখন আমার কেন তাকে ‘ল্যাবদু-গেবদু’ মনে হয়! বেশীরভাগ ছেলে যার জন্য পাগল হয় আমার কেন তাকে মদন কটকটি মনে হয়!! কেন বাস্তবজীবনের পড়ুয়া মেয়েটিকেই অনেক বেশি এট্রাকটিভ লাগে?
কেন? কেন? কেন?
এখন খানিকটা জেনেছি।
স্যাপিওসেক্সুয়ালিটি(Sapiosexuality) এক ধরণের এট্রাকশন- যেটা শরীরকেন্দ্রিক না বরং কারো বিবেক,বুদ্ধি,চিন্তা, শিক্ষা, চেতনা,রুচি, আচরন, ম্যাচিউরিটি, জীবনবোধ দেখে জন্মায়।এমনকি সামনাসামনি না দেখে,ডেটিং সেটিং, গিফটি আদান প্রদান না করেও, গভীরভাবে প্রেমে পড়া সম্ভব। এবং সেই প্রেমের আবেদন আবার অদ্ভুতভাবে দারুন শরীরীও বটে! অভিধানে বলা হয়েছেঃ A sapiosexual person is someone who finds intelligence and the human mind to be the most sexually attractive feature in the opposite sex. অর্থাৎ একজন স্যাপিওসেক্সুয়াল বিপরীত লিঙ্গের কারো শরীরের সোন্দর্য দেখে নয় বরং আকৃষ্ট হয় তার বুদ্ধি ও মনের সৌনদর্য দেখে। এরা বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা বলার সময় বুদ্ধিদীপ্ত কথাগুলো শুনেই মুগ্ধ হয়, শিহরিত হয়!
যেমন মনে করুন ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে বা পত্রিকার একটা লেখা দেখে লেখক/লেখিকার প্রতি আপনি আকৃষ্ট হলেন। লেখক/লেখিকার জানার গভীরতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, ভাবনার সৌন্দর্য, রসবোধ কিংবা সৃষ্টিশীলতা ইত্যাদি দেখে নিজের অজান্তেই মুগ্ধ হয়ে গেলেন তার লেখনিতে। আরো কয়েকটি লেখা পড়ার পর হঠাৎ অনুভব করলেন আপনি শুধু তার লেখার প্রতিই নয় বরং ব্যক্তি লেখক/লেখিকার প্রতিই দুর্বল হয়ে গেলেন! খুঁজে খুঁজে তার অন্যান্য লেখা পড়তে থাকলেন। স্বপ্নের রাজপুত্র/রাজকন্যা মনে করে কল্পনার রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার সাথে দেখা করার আগ্রহ বোধ করছেন। কাছে পাওয়ার আকাঙ্খা জেগে উঠছে! এভাবে একজন মানুষকে না দেখে, তার রুপ, শরীর সম্পর্কে না জেনেই শুধু তার বিদ্যা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন। যে প্রেম আবার শুধু নিষ্কাম নয়, শারীরিক আকর্ষনও চলে আসে!
কারো চেহারা,বাহ্যিক গঠন, গায়ের রং,ব্যাংক ব্যালেন্স, বংশ দেখে যে আকাঙ্ক্ষা জন্মে তার স্থায়ীত্ব বড়জোর মোহ থাকা সময়টুকু পর্যন্ত।মোহ কেটে গেলে আর্কষনও কেটে যায়।কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রিয় মানুষের রুচি, বুদ্ধি, বিদ্যা লোপ না পেলে আকর্ষণ এর মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই বিশেষ সেক্সুয়াল টাইপটিকে মনস্তাত্ত্বিকরা চিহ্নিত করেছেন ‘স্যাপিওসেক্সুয়ালিটি’ হিসেবে।
ভার্চুয়ালি ২০০২ সালে জনৈক ব্লগার প্রথম Sapiosexuality টার্মটি ব্যবহার করেন।
২০১৪ তে বিখ্যাত ডেটিং সাইট ‘ওকেকিউপিড’ স্যাপিওসেক্সুয়ালদের জন্য আলাদা ক্যাটিগরি ওপেন করে এই সাইটে। গেল অক্টোবরে স্যাপিওসেক্সুয়ালদের জন্য লঞ্চ হল ডেটিং অ্যাপ। ‘স্যাপিও ইন্টালিজেন্ট ডেটিং অ্যাপ’ নিয়ে এই মুহূর্তে হইচই পড়ে গিয়েছে যৌনতা-সংক্রান্ত সমাজবিদ্যাচর্চাকারীদের মধ্যে।
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোতে দিনদিন বাড়ছে বুদ্ধিদীপ্ত পোস্টের প্রতি আকর্ষণ। শুধুমাত্র পোস্ট বা স্ট্যাটাসে বুদ্ধির ছাপ দেখে মানুষ খুঁজে নিচ্ছেন বিপরীত লিঙ্গের পছন্দের ব্যক্তিকে ।এখন আর প্রোফাইল পিকচারে তাদের মন ভরছে না!! নতুন কি স্ট্যাটাস থাকছে পছন্দের মানুষের আইডিতে শুধুমাত্র তা চেক করতেই বড় সংখ্যক কিছু মানুষ সোস্যাল সাইটগুলোতে ঢু মারছে নিয়মিত।
সমাজবিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলছেন, এ থেকে আবার নতুন শ্রেণিবিভাজন জন্ম নেবে না তো?! স্যাপিওসেক্সুয়ালদের বক্তব্য- এতকাল তো শরীরীদের দাপট সহ্য করেছেন তারা, এবার তাদের সময় ! এবার সময় বুদ্ধি, সৃষ্টিশীলতার! শুধু বুক, কোমরের মাপ কিংবা সিক্স প্যাক, পেশী দেখে নয় বরং এবার বুদ্ধির সৌন্দর্যে বাড়বে যৌন আকর্ষন!

***
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে যে কটি প্রবৃত্তি মানুষকে তার ইচ্ছায়/অনিচ্ছায় প্রবলভাবে প্রভাবিত করছে, যৌনাকাঙ্ক্ষা এর মধ্যে অন্যতম।
যদিও আমাদের দেশে এই অতি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রবৃত্তিটিকে নিয়ে এত বেশি হাইড এন্ড সীক খেলা হয় যে মনে হয় সেক্স একটা গোপন পাপাচার সমৃদ্ধ কোন খারাপ কাজ।
ফলশ্রুতিতে বিকৃত যৌনতার অধিকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা ভয়াবহ রকমের বেশি আমাদের সমাজে। বিকৃত যৌনাচার যেন রোজকার রুটিন ওয়ার্ক হয়ে উঠেছে এই লুকোচুরি খেলা সমাজে। এই লুকোচুরি খেলা শেষ হওয়ার একান্ত প্রয়োজন। এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাপক যুক্তি সঙ্গত প্রচার এবং সচেতনতা ছড়িয়ে প্রচলিত ট্যাবুগুলো ভাঙা প্রয়োজন।
উপযুক্ত বয়স অনুযায়ী বিজ্ঞান সম্মত যৌনশিক্ষা এখন সময়ের দাবি মাত্র। এতে করে আমাদের দেশের মানুষ পর্ণ দেখে ফ্যান্টাসিময় যৌনতা শিখবে না, চটিজাতীয় বই থেকে অপজ্ঞান লাভ করবে না, পাড়াতো বড় ভাই বন্ধু,কলিকাতা হারবাল টাইপ জায়গা থেকে ভুল তথ্য শিখবে না।
প্রিয় পাঠক, একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে জৈবিক চাহিদাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আমি মনে করি।তবে তা অবশ্যই সুস্থ সুন্দর পদ্ধতিতে, বিকৃত অনাচারে না।
আমি কখনোই বলছি না আপনি যাবতীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক,ধর্মীয় রীতিনীতিকে বৃদ্ধা আঙ্গুলী দেখিয়ে অনাচার অবাধ অনিয়ন্ত্রিত যাচ্ছেতাই জীবন যাপন শুরু করুন। ব্যাপারটা এমন না যে সবাইকেই Sapiosexual হতে হবে।যে যেমন সে তেমনই থাকুক।তবে সুস্থ sex concept নিয়ে থাকুক।বিকৃত যৌনাচার নিয়ে নয়।
দয়া করে ভুল ব্যাখ্যা করবেন না লেখাটির।
নিজে সঠিক তথ্য জানুন।আশেপাশের সবাইকে সচেতন করুন।
সুস্থ সুন্দর থাকুন শরীরে এবং মনে।
লেখক : সোহাইল রহমান














