রাশোমন: জাপানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে চিনিয়েছে যে সিনেমা

0
রাশোমন: জাপানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে চিনিয়েছে যে সিনেমা

জাপানি সিনেমার কথা উঠলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্দান্ত সব অ্যানিমের চিত্র। অ্যানিমে দিয়ে বিশ্ব জয় করা জাপানি চলচ্চিত্রের রয়েছে অ্যানিমে ছাড়াও সমৃদ্ধ ইতিহাস। রাশোমন সেই ইতিহাসের অন্যতম বড়ো অংশ। চলচ্চিত্রের যারা নিয়মিত দর্শক, তাদের কাছে ‘রাশোমন’ অতি পরিচিত নাম। আকিরা কুরোসাওয়ার অনবদ্য নির্মাণে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় এটিকে। ১৯৫০ সালে নির্মিত এই সিনেমা দিয়ে জাপানের চলচ্চিত্রাঙ্গন সমাদৃত হয় পশ্চিমা বিশ্বের কাছে। একইসঙ্গে নির্মাতা হিসেবে কুরোসাওয়ার উত্থান এবং জাপানের এগিয়ে যাওয়ার শুরু সেই থেকে।

বৃষ্টি ভেজা সময়। তিনজন পুরুষ বসে আছেন ভাঙ্গা এক কেল্লায়। কথা জমতে শুরু করে। একজন সেখানে নিজের জীবনের ঝাঁপি খোলেন। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে রোমহষর্ক ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে শিউরে উঠেন তিনি। বাকী দুই শ্রোতার পাশাপাশি শিউরে উঠবে দর্শকও! সত্য, মিথ্যা, ভ্রম, কামনা, আকুতির মায়াজালে কখন আটকে পড়বে, টের পাওয়া যাবে না।

জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে এক কাঠুরে একটি মৃতদেহ দেখতে পায়। পুলিশকে জানায় সে। তারা তদন্তে নামে। প্রধান সাক্ষী হিসেবে কাঠুরের জবানবন্দি নেয় আদালত। কাঠুরে ছাড়াও সেখানে আরও তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী থাকেন। তারা নিজেদের বয়ান দেন। গোলযোগ বাঁধে তখন, যখন তিন সাক্ষীর একজন জবানবন্দি দিতে আসে! কারণ, কাগজে কলমে তিনি মৃত! এরচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, তিনিই সে ব্যক্তি যার মৃত্যু রহস্য উন্মোচন করতে আদালত বসেছে! কেমন লাগবে যখন দেখবেন, যাকে খুন করার দায়ে চলছে মামলা সেই তিনিইবর্ণনা করছেন কাহিনী? দেড় ঘন্টার সিনেমায় দর্শক নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হবে। এরপর চোখ ফেরাবার অবকাশ থাকবে না।

বর্তমান সময়ে এমন প্লট মোটামুটি স্বাভাবিক হলেও পঞ্চাশের দশকে তা ছিল ভাবনাতীত। পরিচালক সেটি ফুটিয়ে তোলেন সুনিপুণ দক্ষতায়। সিনেমার সবচেয়ে বড়ো বিষয়টি হচ্ছে, সকলে সাক্ষ্য দিলেও কোনো বিচারক নেই! মামলার বিচারক দর্শক স্বয়ং! সাত দশক আগের সিনেমা হলেও এতটুকু মলিন নয়। দর্শকের মাইন্ড নিয়ে যে খেলা শুরু করেন আকিরা, তাতে তিনি লেটারমার্ক নিয়ে সফল। চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি, শৈল্পিক উপস্থাপনের পাশাপাশি কুশলীদের সতেজ ও সাবলীল অভিনয়ে এই সিনেমার আবেদন কখনও এতটুকু কমার সম্ভাবনা নেই। ২৫তম অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল রাশোমনকে। মজার ব্যাপার হলো, মুক্তির পর অন্যরা সাদরে গ্রহণ করলেও জাপানের সিনে সমালোচকরা এটিকে ভালো ভাবে নেননি। এর পেছনে অবশ্য কারণ আছে! রাশোমনের এন্ডিং নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। মুক্তির প্রায় তিন দশক পর পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া এর ব্যাখ্যা দিলেও পুরোটা খোলাসা করেননি। কিংবদন্তি আকিরা কুরোসাওয়া ওপেন এন্ডিং রেখেছেন দর্শকের জন্য। যেখানে দর্শক নিজেই বিচারক, সেখানে শেষ পরিণতির ভারও তাই দর্শকের হাতে ন্যস্ত করেন আকিরা।

আঁধারের শেষে আলোর আগমন। মৃত্যুতে শুরু হওয়া সিনেমায় গল্পের শেষ হয় জন্ম দিয়ে। স্বার্থপর হতে না পারলে সংগ্রাম করতে পারবে না। – সিনেমার শেষাংশে বলা এমন আরও কিছু সংলাপ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও জীবন্ত। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে ব্যক্তির আপন সত্তাকে। সিনেমাকে কেউ কেউ জীবনের আয়না বলেন। সেই আয়না, যেখানে নিজেকে লুকানোর কিছু থাকে না। আসলেই থাকে না? মানুষ সবসময় নিজের কাছে সত্য বলতে পারে? পারে না। সত্যের মুখোমুখি হতে সাহস লাগে যা সকলের নেই। পুরনো এসব আপ্ত বাক্যই রাশোমনে ফুটে উঠেছে পুরো সময়টায়।