ছেলে জুয়ার আসরের ভিডিও ভাইরাল করায় বাবাকে তুলে নিয়ে মারধর!

0

কক্সবাজার সদরের ইসলামপুরে দিনেদুপুরে চলা জুয়ার আসরের একটি ভিডিও প্রশাসনকে সরবরাহ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়েন এলাকার এক প্রতিবাদী তরুণ হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মো. শাহেদুল ইসলাম। কিন্তু এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাবা ফরিদুল আলমকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে এমন অভিযোগ ওঠে জুয়ার আসরে থাকা চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে।

গত শুক্রবার ৯ই জুলাই বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে বৃদ্ধকে পাহাড়ের ভেতরের একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করে কক্সবাজার পুলিশ।

এ ঘটনায় চারজনের নাম দিয়ে এবং ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা দেখিয়ে ঈদগাঁও থানায় এজাহার দিয়েছেন মারধরের শিকার বৃদ্ধ ফরিদুল আলম। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনায় অভিযুক্ত আসামীরা হলেন, কামাল হোসেন (৩৮), মো. শরিফ (৪৫), এরশাদ (৩০) ও রমজানসহ (৩৮ ) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম এজাহার পাওয়া ও ভিকটিমকে পুলিশ কর্তৃক উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দায়েরকৃত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ফরিদুল আলম ইসলামপুর এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং একজন সমাজসেবক। কিন্তু অভিযুক্তরা এলাকায় খারাপ প্রকৃতির ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। জানা যায়, ২ নম্বর অভিযুক্ত শরীফের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও নেতৃত্বে অন্য অভিযুক্তরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন এলাকায় মাদক ব্যবসা, পাহাড় কাটা, জুয়ার আসর বসানোসহ নানা অপরাধ সংঘটন করে আসছে। কিন্তু অপরাধীরা সবাই একীভূত এবং শরীফের ভাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান হওয়ায় তাদের অপরাধের বিষয়ে জানলেও কেউ কখনো প্রতিবাদ করার সাহস পান না। কিন্তু তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহেদুল ইসলাম বেশ কিছুদিন যাবৎ তাদের কৃত অপরাধের বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণসহ তথ্যাদি প্রশাসন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরবরাহ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে আসছিলো।

গত ৬ জুলাই মঙ্গলবারও অভিযুক্তরা এলাকায় প্রকাশ্যে জুয়ার আসর বসান। সেটি কে বা কারা যেনো ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ভিডিওর কপি আমার ছেলের হাতে গেলে সে প্রশাসনকে সরবরাহ করে এলাকার নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয় তুলে ধরে তার ফেসবুকে প্রচারের মাধ্যমে।

কিন্তু এটিই কাল হয়। জুয়া খেলার ভিডিও প্রচারের পর অভিযুক্তরা ফরিদুলের পরিবারের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গত বৃহস্পতিবার সকালে ফরিদুল নতুন অফিস বাজারে গিয়ে ধলা মিয়ার চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। এমতাবস্থায় দুপুর সাড়ে ১২টার সময় অভিযুক্তরা অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাকে ইজিবাইকে (টমটম) তুলে প্রথমে বটতলী শরিফ ট্রাসপোর্ট অফিসে নিয়ে যায় এবং শরিফের নির্দেশে সেখানে অন্য অভিযুক্তরা তাকে মারধর করেন। আধাঘণ্টা পর তার চোখে কাপড় বেঁধে পুনরায় গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।

গহীন পাহাড়ের একটি বাড়িতে নিয়ে ওই বৃদ্ধকে আবারও মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে অভিযুক্তরা ৩০-৩৫ বছরের অজ্ঞাত এক নারীর সঙ্গে তার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। অবশেষে তারা ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি নন জুডিশিয়াল খালিস্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেয়।

পরবর্তীরে তার ছেলে শাহেদ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে বিকেল ৩টার দিকে ঈদগাঁও থানার একদল পুলিশ এসে ফরিদুলকে উদ্ধার করে।

ফরিদুলের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহেদুল ইসলাম জানান, ‘আমার মা দীর্ঘদিন যাবত সংরক্ষিত আসনের মেম্বার ছিলেন। তিনি এলাকার অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়েছেন আর সেসব দেখেই আমার শিশু বেলা কেটেছে। তাই বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সেই প্রতিবাদী চরিত্র আমার ভেতর জাগ্রত ছিল। এজন্যে এলাকার যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে কথা বলি। তবে এটাই যে এভাবে কাল হয়ে দাঁড়াবে বুঝিনি।’

তিনি আরও জানান, জুয়াড়িরা তাকে মোবাইলফোনে কল করে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এর অডিও রেকর্ডও তার কাছে রয়েছে। তাদের মারধরে তার বৃদ্ধ বাবা মারাত্মক জখম হয়েছেন। তিনি গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মো. শরীফের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

শুক্রবার কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পাওয়ার সাথে সাথে বৃহস্পতিবার আমি ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করি। এজাহার পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত যে বা যারাই থাকুক না কেনো তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঈদগাঁও থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপ জানতে চাইলে ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হালিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’