একদিকে পণ্যের দাম বেশি, অন্যদিকে আয় কম হওয়ায় গ্রামের মানুষের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুষ্টিমানে। যে কারণে গ্রামের মানুষ শহরের তুলনায় বেশি পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত। আয় কমার কারণে তাদের অন্যান্য খাতেও ব্যয়ের পরিমাণ কমেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সার্বিক জীবনযাত্রার মানে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত ‘খানা আয় ব্যয় জরিপ-২০১৬’ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, গ্রামে মোট খাদ্য গ্রহণের হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
২০১৬ সালে একটি পরিবারের মোট খরচের ৪৭.৬৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে খাদ্য ও পানীয় ক্রয় করতে। কিন্তু ২০১০ সালে পরিবারপ্রতি এ খরচ ছিল ৫৪.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে ৫ বছরের ব্যবধানে খাদ্যে ব্যয় কমেছে প্রায় ৭.১২ শতাংশ। খাদ্য খাতে ব্যয় কমার প্রভাব পড়েছে খাদ্য গ্রহণের ওপর। গ্রামে একদিকে খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে খাদ্য খাতে তাদের ব্যয় কমেছে।
এ তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর মানে দাঁড়াচ্ছে গ্রামের মানুষের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে তারা কম ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে গ্রামের মানুষ দৈনিক মাথাপিছু ১ হাজার গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করত। ২০১৬ সালে এর পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭৬ গ্রাম। ওই সময়ে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমেছে ২৪ গ্রাম। এর মধ্য চাল ও আটা খাওয়ার হার আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে ডাল, শাক-সবজি, মাছ, মুরগির মাংস ও ডিম খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে চাল ও আটা গ্রহণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে দৈনিক ৪১৬.০১ গ্রাম ও ২৬.০৯ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৬৭.১৯ গ্রাম ও ১৯.৮৩ গ্রামে। ফলে খাদ্যে ক্যালরি গ্রহণের হারও কিছুটা কমেছে। ২০১০ সালে মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ হাজার ৩১৮.৩ কিলোক্যালরি, যা ২০১৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১০.৪ কিলোক্যালরি। প্রোটিন গ্রহণের হার ২০১০ সালে ছিল ৬৬.২৬ গ্রাম, যা ২০১৬ সালে ৬৩.৮০ গ্রামে নেমে এসেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এমএ সাত্তার ম-ল বলেন, খাদ্যের পাশাপাশি অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণেও মানুষ সচেষ্ট। কিন্তু যখন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় তখন চাহিদার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। খাদ্য পণ্যের দাম বেশি থাকায় এ খাতে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে পুষ্টির মানে। এ কারণে স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫.৯২ শতাংশ সাধারণ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ৪.৯০ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৫.৪৪ শতাংশ হলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬.০২ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যে পণ্য ১০০ টাকা দিয়ে কিনতে হতো তা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কিনতে হয়েছে ১০৬.০২ টাকায়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭.৮৭ শতাংশ।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, সাধারণত আয়ের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয় খাদ্য পণ্য ক্রয়ে। এক বছরের ব্যবধানে খাদ্য পণ্যের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক হিসাব-নিকাশ করে খাদ্য গ্রহণ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কম ব্যয়ে বেশি পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় এ ধরনের খাদ্যাভাসে ঝুঁকছে মানুষ। কিন্তু এসব পণ্যেরও দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে খাদ্য ব্যয় হ্রাস করেছে।












