জীবনানন্দের নারীরাঃ দেবী নয়,পরী নয়, রক্ত মাংসের মানুশ

0
জীবনানন্দ দাশ

বাঙলা কবিতার ইতিহাসে, জীবনানন্দই প্রথম কবি, যিনি নারীর দিকে তাকিয়েছিলেন, সমকালীন সকলের থেকে অদ্ভুত এক দুরত্বসহকারে, পরিপূর্ণ আধুনিক দৃষ্টিতে। বাঙলা কবিতায় নারীর তখন কী অবস্থা? রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নারী ঘোর রহস্যঘন, তার দেহরুপ, আর অলঙ্কারের বর্ণনার তলে চাপা পড়ে যায় তার মানস, আর রবিঠাকুরের সুফিটাইপ গানগুলিকে যদি প্রেমের গান ধরি, তাহলে, রবীন্দ্র কবিতায় নারী তেমন নয়, যেমন তার জীবনে; রবীন্দ্র কবিতায় নারী এক কল্পলোকের জগতের আলোছায়ার খেলা। নজরুলের কবিতায়ও তাই, নজরুল একধাপ সরেসও বটেন; প্রিয়ার পুজোকেই প্রেমজ্ঞান, আর তার দেয়া ব্যথার প্রতিক্রিয়ায় আরো আরো প্রেম-পুজো কিংবা নাবালক অভিমান (যখন আমি হারিয়ে যাব বুঝবে সেদিন বুঝবে) প্রকাশ, তার কবিতায় নারীকে করে তুলেছে দেবীতুল্য। মোটকথা, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কবিতার নারী ইহজগতের কেউ নন। তারা ‘প্রিয়া’, ‘স্বপ্ন-সহচরী’, ‘প্রিয়তমা’; তাদের কোন নাম নাই, নামহীন এক দূরতম রুপের জগত তারা। নারী তাদের কবিতায়, অতিশয় পবিত্রও বটে! তারা ব্যথা দিলেও, হৃদয় ভাঙলেও, তাদের পদতলে পড়ে থাকাই যেন প্রাপ্তি, যেন তারা ঈশ্বরী, যেকোন মূল্যে তাদের খুশি করাই প্রেমিক তথা পুরুষের অভীষ্ট! রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের এহেন ‘নারীবাদ’ বঙ্গে যে নারীদর্শনের জন্ম দিয়েছে, সেখানে, নারীর প্রসঙ্গ এলে সকলেই অপার্থিব জগত থেকে নামিয়ে আনেন শব্দমালা, আর মালা গাঁথেন মহান মহান কল্পলোকের রুপকথা দিয়ে। তারপর, সেই দেবীটিকে পুজা করতে থাকেন, বাস্তবজীবনের নারীটিকে বিসর্জন দেন গঙ্গায়!

জীবনানন্দ আমাদের কবিতায় তো বটেই, মননে-মস্তিষ্কেও, এ ভূখণ্ডের প্রথম পরিপূর্ণ আধুনিকতম পুরুষ। খেয়াল করুন, জীবনানন্দের দাম্পত্যের কথা, যা আমাদের আধুনিক দাম্পত্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। জীবনানন্দ সেই যুগে, যে যুগে বিয়ের কন্যাকে মোটামুটি কোরবানির গরুর মত করে বেছে নিখুঁত করা হত, সেই যুগে তিনি, কাদামাখা একটা শাড়িসমেত কলেজফেরত লাবণ্যকে একঝলক দেখে পছন্দ করেছিলেন, যাতে আশ্চর্য (ও কিছুটা মুগ্ধও, হয়ত) হয়েছিলেন স্বয়ং লাবণ্যও! যৌতুকও নেননি, সেইসময়, যৌতুক যখন গায়ে হলুদের মতই, বিয়ের কার্যবিধিরই অংশ। নারীর ব্যাপারে জীবনানন্দের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় তার দাম্পত্যজীবনের আরো খুঁটিনাটি ঘটনায়, সেদিকে যাব না।

জীবনানন্দ কবিতায় প্রথম, নারীকে তার দৈহিক রুপের জন্য যে পুজো দেয়া হয়েছে বিগত শতাব্দীতে, তাকে মনুশ্যসমাজ থেকে আলাদা করে যে কল্পলোকের দেবীর আসনে বসানো হয়েছে, সেই কল্পলোকটিকে ভেঙে দিয়ে, নারীকে নিয়ে আসেন মাটির পৃথিবীতে, মানুশের ভীড়ে। অধিকাংশ বাঙালি কবির দিস্তা দিস্তা কাগজ নষ্ট হয়েছে, কেবল, নারীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর গয়নাগাটির জৌলুশের বর্ণনায়, তাদের নারীরা অনুভবনীয় না, হয়ে উঠেছেন দর্শনীয়, তাদের যা কিছু প্রশংসা করা হয়েছে, তা ওই সবেধন নীলমনি দেহটির কারণেই, তাদের মননের, মেধার, স্বভাবের কোন বিশ্লেষণ বা উপস্থাপন, সেসবের প্রতি আগ্রহ কারো হয়নাই। কিংবা তাদের ক্লেদ, পাপ; তাদের দেবীতুল্য দেহের ভেতরে যে মানুশ, তার সহজাত স্খলনের কথা, কেউ বলে নাই। জীবনানন্দের নারীদর্শন আশ্চর্যরকম নির্মোহ। সেখানে নারীকে দেবী করার প্র‍য়াস নাই, তার কাছে নিজেকে জলাঞ্জলি দেয়ার প্রতীতি নাই, বিংশ শতকের নারীবাদে সায় নাই, নারীর প্রতি কুটিল বিদ্বেষেও মতি নাই-এক আশ্চর্য নিরপেক্ষতায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীর নারীদের তিনি দেখেছেন বাস্তবজগতের একজন, ‘পুরুষ’ না, ‘মানুশ’ হিশেবে। আর তাই, ‘প্রিয়া’, ‘স্বপ্ন-সহচরী’, ‘প্রিয়তমা’ বা ‘দেবী’দের নয়, জীবনানন্দ ভালোবেসেছেন ‘মেয়েমানুশেরে’! ভালোবাসা জীবনের অতলান্তিক সমুদ্রে একবিন্দু জলের মত ঘটনা, প্রেয়সী আরো দশটা মেয়ের মতই মেয়েমানুশ। প্রেমিক তার পুজারী না। জীবনানন্দ অকপটে বলছেন, তিনি ঘৃনাও করেছেন ‘মেয়েমানুশেরে’! কারণ, তারা দেবী নন, তারা মর্ত্যের মানুশ, তারা বিংশ শতকের সমূহ বিনষ্টের চিৎকারকে ধারণ করে। জীবনানন্দ নারীকে আর কী কী বলে ডেকেছেন? ‘মানুষী’, নারীর জন্য মানুশের বিপরীতে এই আশ্চর্য শব্দ প্রথম তিনিই ব্যবহার করেছিলেন। জীবনানন্দের নারী ‘মানসী’ নয়, যার বাস মানসজগতের কল্পরাজ্যে, তার নারী এই মর্ত্যলোকের ‘মানুশী’!

জীবনানন্দের নারী ‘পুজা’ নেয় না, বরং সেক্স করে, তারপর রুপকথার দেশে না, মানুশের ভীড়েই হারিয়ে যায়! ‘তোমার শরীর,/তাই নিয়ে এসেছিলে একবার, তারপর মানুশের ভীড়/তোমারে নিয়াছে কবে টানি!’ জীবনানন্দ জানেন, ধ্রুব অমর প্রেম বলে বিংশ শতকের পৃথিবীতে কিছু নাই, বা, আসলে প্রেম কখনো ধ্রুব নয়, হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রেমের চে কামকেই সত্য দেখি। প্রেমের ইতিহাসে বেদনাই বিজয়ী। ফলে জীবনানন্দ জানেন, ‘প্রেম শুধু একদিন এক রজনীর’! আর তাই, প্রেমিকার বিট্রেয়াল, তার চলে যাওয়াকে এক দার্শনিক মহিমায় বিশ্লেষণ করে, খুব সহজে গ্রহন করেন তিনি, মাটির নারীর জন্য কাতর হন না, রবীন্দ্র -নজরুলের মত, এগুলোকে গ্রহন করেন জীবনের সাবালক স্বাভাবিকতায়, বলেন-‘যেতে হবে বলে/তুমি গেছ চলে/সবাই চলিয়া যায়/সকলের যেতে হয় বলে!’ কেউই আসলে যায় না, যেতে হয়-এই সত্য আজ আমাদের সামনে কত পষ্ট!

রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের নারীপুজা আর কামনার অর্ঘ্যদানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, নারীর দেহরুপের পুজা। নারীর দেহখানা তাদের কবিতায় যত এসেছে, মন তত নয়, যেটুকুওবা এসেছে, তা খণ্ডিত। বিপরীতে দাঁড়িয়ে, জীবনানন্দই খুব শাদামাটাভাবে নারীকে বলেছিলেন, ‘সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত।’ যে রুপের জন্য নারীর এত বন্দনা, সেই রুপকে তিনি ‘মৃত’ ঘোষণা করছেন। সুদর্শনাকে বলছেন ‘তোমার মতন এক মহিলা!’ রুপের বর্ণনা যে দেন নাই জীবনানন্দ, তা নয়। তা কেমন তার নারীর রুপ?

“দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা;
সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে যেই পাখি দেয় ধরা-
বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর,
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ শোনে যার স্বর।
কড়ির মতন শাদা মুখ তার,
দুইখানা হাত তার হিম;
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম
চিতা জ্বলেঃ দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়
সে আগুনে হায়।
চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র- কবেকার শঙ্খিনীমালার!”

‘বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা’ দেহ, ‘কড়ির মতন শাদা মুখ’, হিম হাত, চোখে হিজল কাঠের রক্তিম চিতা, পাশাপাশি সেই আগুনের তলেই ‘শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার’, ‘করুণ শঙখের মত’ স্তন-এরকম প্রেমিকা এ পৃথিবী একবার পায় না শুধু, এ পৃথিবীর একজনই এরকম প্রেমিকার কথা ভাবতে পারেন, তিনি জীবনানন্দ। খেয়াল করার ব্যাপার, রবীন্দ্র-নজরুলের প্রেমিকাদের প্রতি লোকের মুগ্ধ হওয়ার মতন যদি কিছু থাকে, তা হলো তাদের দৈহিক রুপ, তাদের দেবীর মত মহিমা। অথচ জীবনানন্দের ‘নারী’-র (প্রেমিকা নয়) রুপ রহস্যময়, এই বর্ণনা থেকে খুব সুদর্শন কোন নারীর ধারণা আমরা পাই না, কেবল অস্পষ্ট, রহস্যময় একটি নারী অস্তিত্বের ধারণা পাই।

বাঙলা কবিতার পাঠককে নারীর দেহপুজা থেকে কীভাবে তার মনের রহস্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন জীবনানন্দ, বাঙালি নারীদের কীভাবে গয়নাগাটি আর ফর্শা ফর্শা মুখশ্রী ছাড়াই অপরুপ করে তুলছেন জীবনানন্দ, কীভাবে তাদেরকে সেক্স অবজেক্ট থেকে মননশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, টের পাওয়া যাচ্ছে কী? আশ্চর্য হলো, স্তনের মত সেন্সুয়াল অঙ্গটির উল্লেখ করেও জীবনানন্দ পাঠককে নারীর শরীরের প্রতি কামোন্মত্ত হতে দেন না, ‘করুণ শঙখের মত’ উপমার পরে, স্তন দুধে আর্দ্র হোক বা না হোক, বোধের অতলান্ত থেকে নারীদেহের প্রতি শস্তা ক্ষুধা জাগে না অন্তত। জীবনানন্দ স্তনের উপমায় ব্যবহার করেছেন আরো বিপন্ন বিস্ময়কর উপমা, ‘সেই জলমেয়েদের স্তন/ঠাণ্ডা, শাদা বরফের কুচির মতন!’ অশ্লীলতা-শ্লীলতার প্রশ্ন না, সেসব ভেবে কবিতা লেখা জীবনানন্দের ধাতে ছিলও না। কিন্তু নারীকে দেহের উর্ধ্বে এক মননশীল জায়গায় তুলে ধরতে তার এই প্রয়াস, বিমুগ্ধচিত্তে প্রশংসার্হ!

নারীকে জীবনানন্দ মানুশ হিশেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাউকে মানুশ বানাতে গেলে, তাকে শয়তান বা জন্তুর বা ভোগ্যপণ্যের পর্যায় থেকে উঠিয়ে আনা যেমন জরুরি, তেমনি এঞ্জেল, হুর, দেবী বা ঈশ্বরীর জায়গা থেকে নামিয়ে আনাও জরুরি। সে কাজটিও করেছেন জীবনানন্দ। উপন্যাসে ও গল্পে তো করেছেনই, সেদিকে যাব না। পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়ানো সুন্দরীদের কানে জ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, মানুশের অর্জন, কবিতা-এসব অমূল্য জিনিশের কথা বলে যে লাভ নাই, ওনারা যে সেগুলো বোঝেন না, সেকথা তিনিই প্রথম বলেছেন। সুন্দরীদের তিনি বলেছেন ‘মূর্খ’, ‘সোনার পিত্তলমূর্তি’! অনেকে ভাবতে পারেন, প্রেমের ব্যর্থতা থেকে এই কাজ করেছেন তিনি। হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জীবনানন্দ প্রেমিক হিশেবে এ যুগের অনেক রোমিওর চে সফল ছিলেন। চাচাত বোন, যাকে বিয়ে করা হিন্দুধর্মে নিষেধ, সেই বোনকে বদ্ধ ঘরে চুমু দিয়েছেন, তার সাথে ওরাল সেক্স করেছেন। তার সাহস ছিল বলতে হবে! এবং, একদিন নয়, অনেকদিন! ফলে, প্রেমে ব্যর্থতা তার থাকলেও, ‘প্রাপ্তি’ যে কিছু ছিল না, তা নয়! যাহোক, নারীকে তিনি ঘৃনাও করেছেন, সেকথাও আমরা তার ‘বোধ’ কবিতায় দেখি। ‘পরী নয়, মানুষও সে হয়নি এখনো’-নারী তার যোগ্য মর্যাদা পায়নি, ঠিক, তবে সে পরী নয়, আর পরী করা রাখলে যোগ্য মর্যাদা সে পাবেও না, একথা জীবনানন্দ ছাড়া কে বলতে পারতেন! নারীর ভেতরের পাপ, পতন, ক্লেদ, স্খলন, তার সৌন্দর্যের অনিত্যতা (এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দের ‘পরস্পর’ বাঙলাসাহিত্যে সবচে রহস্যঘন এক কবিতা) এসব বারবার উঠে এসেছে তার লেখায়। নারীকে মানুশ হিশেবে পেতে হলে, আগে ‘পরী’র ধারণা ভাঙা জরুরি, এই বোধ জীবনানন্দের স্বোপার্জিত।

শেষ করি। জীবনানন্দের কবিতায় নারীচরিত্রের মহত্তম প্রতিনিধি যিনি, বনলতা সেন, তিনিও রবিঠাকুরের পূর্বজন্মের প্রিয়ার মত ‘মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে/কর্ণমূলে কুন্দকলি কুরুবক মাথে’টাইপ সাজসজ্জায় অতিশয় নিমজ্জিত কোন নারী, কিংবা নজরুলের ‘তোমারে বন্দনা করি, স্বপ্ন-সহচরী/ লো আমার অনাগত প্রিয়া’-র মত দেবীটাইপ কেউ নন। জীবনানন্দ নাম ধরে ডেকেছেন, বনলতা সেন, ‘প্রিয়া’, ‘দেবী’, ‘প্রিয়তমা’, ‘আফ্রোদিতি’টাইপ কিছু বলেন নাই। এই যে নাম ধরে ডাকা, এর মধ্যে আছে নারীকে বাস্তবপৃথিবীর এক পুরুষ বা মানুশের চোখে দেখার ইঙ্গিত। ‘প্রিয়া’ বললে কেবল প্রেমের, অধিকারের (হা হা! অত্যাচারেরও) সম্পর্ক তৈরি হয়, স্বাভাবিক মনুষ্যপরিচয় তৈরি হয় না। বনলতা সেনকে জীবনানন্দ সেই পরিচয় দিয়েছেন, যেকারণে, রবীন্দ্র-নজরুলের কবিতার প্রিয়াদের কেউ চেনে না, অথচ বনলতা আজ জীবনানন্দের চেয়েও বিখ্যাত! জীবনানন্দ তার কবিতায় প্রায় সব নারীকেই নাম ধরে ডেকেছেন-বনলতা, শ্যামলী, মৃণালিনী ঘোষাল, অরুনিমা স্যানাল- এই নামগুলো নারীকে যে বাস্তবতায় ধারণ করে, ‘আসমা’, ‘আয়শা’ বা ‘ফাতেমা’ ডাক নারীকে যে মানবিক প্রতিষ্ঠা দেয়, ‘ওগো’ বা ‘প্রিয়া’ তার থেকে যোজন যোজন দূরে।

রবিঠাকুরের প্রেমিকার মত ভারী ভারী গয়নায় সাজিয়ে, তার নিজের চে ওই গয়নার বর্ণনায় দশলাইন বেশি খরচ করেন নাই, নজরুলের মত না-পাওয়ার বেদনায় ভক্তের মত পুজার ভেট হাতে পড়েও থাকেন নাই জীবনানন্দ। তিন প্যারার কবিতার একটিমাত্র প্যারায় রুপের বর্ণনা এসেছে, তাও মাত্র তিনটি অঙ্গের। গয়নাগাটির বালাই নাই। তাও সে কেমন রুপ? বনলতার চুল ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন নগরীর রাতের অন্ধকারের মত, মুখও ইতিহাসের পাতায় জেগে থাকা বিখ্যাত এক শহরের স্থাপত্যশৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বনলতার আর একটি মাত্র অঙ্গের বর্ণনা জীবনানন্দ দেন, চোখ। পাখির নীড়ের মত। এসব উপমায় খুব সুশ্রী কোন নারীর চেহারা ভাসে না। নারীকে সুশ্রী দেখানোই যেখানে কবিদের যাবতীয় উপমার আরাধ্য ছিল, জীবনানন্দ সেখানে, নারীর সৌন্দর্যকে উপস্থাপন করলেন ইতিহাসচেতনা আর বোধের সমান্তরালে! এর মাধ্যমে নারীও কি কোন মেসেজ পেতে পারে না? যারা তাদের দেহবন্দনায় মেতে তাদের চোখকে অন্ধ করে রেখেছে ইতিহাস, দর্শন, শিল্প, রাজনীতি-পৃথিবীর যাবতীয় মহৎ বিষয় থেকে, তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারীদের ইতিহাসের সমান্তরালে উপস্থাপন, এ যে তাদেরকে প্রচ্ছন্নভাবে ইতিহাসের উত্তরাধিকার গ্রহনের আহ্বান, ভাবতে খুব কি দোষ!

জীবনানন্দের কবিতা পড়ে অনেক মূর্খ নারীবাদী কিংবা টিপিকাল বাঙালি মূর্খতাপ্রিয় নারী কষ্ট পেতে পারেন। কিন্তু, ‘পরী নয়, মানুষও সে হয়নি এখনো’- বলে শিল্পসাহিত্যে নারীকে যে পূর্ণ মানবিক প্রতীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জীবনানন্দ, তাতে নারীর প্রতি পুরুষের গত শতাব্দীর মেকি দরদের স্বরুপ ধরা পড়ে গেছে, ধরা পড়ে গেছে পুঁজির যুগে নারীকে পণ্য বানানোর পেছনে এইসব শিল্পী-সাহিত্যিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক মদদও! আর অন্যদিকে, সাহিত্যের নারী বাস্তবের নারীর কাছাকাছি যেতে পেরেছে। ফলে বলা যায়, আমাদের সাহিত্যে, রবীন্দ্র-নজরুলের প্রেমকাতরতামূলক পদ্যের বিপরীতে, জীবনানন্দের কবিতাই প্রেম ও নারী বিষয়ক সবচে বাস্তব, সাবালক ও মানবিক কবিতা।

লেখকঃ তুহিন খান
তরুণ কবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে